অথবা, শঙ্করাচার্যের মায়া বিষয়ক মতবাদ ব্যাখ্যা কর। রামানুজ কীভাবে এ মতবাদ খণ্ডন করেন?
অথবা, রামানুজ কীভাবে শঙ্করের মায়াবাদ খণ্ডন করেন আলোচনা কর।
অথবা, শঙ্করের মায়াবাদ ব্যাখ্যাপূর্বক রামানুজ কর্তৃক এ মতবাদ খণ্ডন সম্পর্কে আলোচনা কর।
উত্তর ভূমিকা
: ভারতীয় দর্শনে মায়া কথাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ভারতীয় দর্শনে মায়া শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বেদে, উপনিষদে, ভগবদগীতা, ব্রহ্মসূত্রে, গৌড়বাদের দর্শনে, শঙ্করের দর্শনে মায়া কথাটির ধারণা পাওয়া যায়। নিম্নে বেদান্ত দর্শনের অন্যতম ভাষ্যকর শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
জগৎ সম্পর্কে শঙ্করের মত বা শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ : জগৎ সম্পর্কে শঙ্কর যে মতামত দিয়েছেন তা নিম্নে তুলে ধরা হলো :
১. জগৎ মিথ্যা এবং মায়ার সৃষ্টি : এ জগৎ স্বপ্নদৃষ্ট বস্তু বা ভ্রম প্রত্যক্ষের বস্তুর ন্যায় মিথ্যা অবভাস মাত্র। এটি মায়ার সৃষ্টি। শঙ্কর বলেছেন যে, “জগৎ যে মিথ্যা ও মায়ার সৃষ্টি এর ইঙ্গিত বেদ ও উপনিষদেও পাওয়া যায়। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, ইন্দ্র মায়ার দ্বারা নানাবিধ রূপ ধারণ করে। বৃহদারণ্যক উপনিষদেও এ কথার স্বীকৃতি রয়েছে।
২. মায়া ব্রহ্মেরই একরকম শক্তি এবং এটি অবর্ণনীয় : শঙ্কর বলেছেন, মায়া ব্রহ্মেরই একরকম শক্তি এবং এটি অবর্ণনীয়। ব্রহ্মের এ মায়াশক্তি জাদুকরের জাদুশক্তির ন্যায় মানুষকে ভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। জাদুকর যেমন তার জাদুশক্তি দ্বারা একটি টাকাকে বহু টাকা বানিয়ে দেখাতে পারে, তেমনি ব্রহ্ম ও তাঁর এ মায়াশক্তি দ্বারা অজ্ঞ মানুষকে অসত্য জগতকে সত্য বলে মনে করাতে পারে। তিনি আরো বলেছেন, জাদুকর যেমন তার জাদুশক্তি দ্বারা অন্য জাদুকরকে প্রতারিত করতে পারেন না এবং নিজেও প্রতারিত হন না, তেমনি ব্রহ্মও তাঁর মায়াশক্তি দ্বারা কোন তত্ত্বজ্ঞানী মানুষকে ভ্রান্তি তে ফেলতে পারেন না এবং নিজেও ভ্রান্তিতে পড়েন না। তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি কেবল ব্রহ্মের সত্তাই উপলব্ধি করেন, জগৎ এবং মায়ার সত্তা উপলব্ধি করেন না। জাদুকরের একটি টাকাকে বহু টাকা দেখাতে পারার কারণ হলো তার জাদুশক্তি এবং মানুষের একটি টাকাকে বহু টাকা দেখার কারণ হলো তার অজ্ঞানতা। অনুরূপভাবে বলা যায়, ব্রহ্মের মায়াশক্তি জগৎ দেখায়, আর সাধারণ মানুষ অজ্ঞ বলে তা দেখে। জাদুকর যেমন জানে তার জাদুশক্তি ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়, তেমনি ব্রহ্মও জানে যে, তাঁর মায়াশক্তি ফাঁকি ছাড়া কিছুই নয়।
৩. ভ্রম প্রত্যক্ষের উপমা ব্যবহার : শঙ্কর মায়া কথাটিকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার জন্য দৈনন্দিন জীবনের অধ্যাস বা ভ্রম প্রত্যক্ষের উপমা ব্যবহার করেছেন। যেমন- অন্ধকার রাতে রজ্জুকে সর্প বলে মনে করা। এ জাতীয় ভ্রম প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে কোন না কোন অধিষ্ঠান বা সত্য বস্তু থাকে এবং এ অধিষ্ঠানের উপর অন্যকিছুর আবির্ভাব কল্পনা করা হয়। এখানে সত্য বস্তু রজ্জু এবং এ ক্ষেত্রে সর্প কল্পনা করা হয়েছে। শঙ্করের মতে, ভ্রম প্রত্যক্ষের কারণ হলো মানুষের অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা। অবিদ্যার দুটি শক্তি আছে, যথা : আবরণ শক্তি ও বিক্ষেপ শক্তি। আবরণ শক্তি দ্বারা অবিদ্যা প্রথমে অধিষ্ঠানকে আবৃত করে আমাদের দৃষ্টি হতে লুকিয়ে রাখে, যেমন- এখানে রজ্জুকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এবং পরে বিক্ষেপ শক্তি দ্বারা মিথ্যা বস্তুর সৃষ্টি করে যেমন- এখানে সর্ম্পকে সৃষ্টি করা হয়েছে। শঙ্কর বলেছেন, অনুরূপভাবে মানুষ তার অবিদ্যাবশত ব্রহ্মকে জগৎ বলে ভ্রম করে। মানুষের অবিদ্যা মানুষ হতে ব্রহ্মকে লুকিয়ে রাখে এবং তার স্থরে জগতকে বিক্ষেপ করে।
৪. ভ্রম এবং মায়া দুটি ভিন্ন সত্তা নয় : শঙ্করের মতে, মায়া ব্রহ্ম হতে ভিন্ন সত্তা নয়। মায়া ব্রহ্মের শক্তি। আগুনের দাহিকাশক ্তিকে যেমন আগুন হতে পৃথক করা যায় না, তেমনি মায়াকেও ব্রহ্ম হতে পৃথক করা যায় না। সুতরাং শঙ্কর মায়াকে স্বীকার করে তাঁর অদ্বৈতবাদের কোন ক্ষতি করেন নি ।
৫. পারমার্থিক দৃষ্টিতে জগৎ মিথ্যা কিন্তু ব্যবহারিক দৃষ্টিতে জগৎ সত্য : শঙ্করের মতে, যে দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানপ্রসূত তা পারমার্থিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারমার্থিক দৃষ্টিতে জগৎ মিথ্যা, একমাত্র ব্রহ্মই সত্য। আর যে দৃষ্টিভঙ্গি অজ্ঞানতা প্রসূত তা ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি আর ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে জগৎ সত্য এবং ব্রহ্মই এর স্রষ্টা, রক্ষক ও সংহারক।
৬. জগৎ ব্রহ্মের বিবর্ত, পরিণাম নয় : শঙ্করের মতে, জগৎ ব্রহ্মের বিবর্ত, জগৎ ব্রহ্মের পরিণাম নয়। পরিণামবাদ অনুসারে কারণ প্রকৃতপক্ষে কার্যে পরিণত হয়। যেমন- দুধ দধিতে পরিণত হয়। সুতরাং দধি হলো দুধের পরিণাম। আবার বিবর্তনবাদ অনুসারে কারণ কার্যে পরিণত হয় না, কার্যরূপে প্রতিভাত হয় মাত্র। যেমন- রজ্জু সর্প রূপে পরিণত হয়
না, সর্প রূপে প্রতিভাত হয় মাত্র। তেমনি ব্রহ্ম জগতে পরিণত হয় না, জগৎ রূপে প্রতিভাত হয় মাত্র।
৭. জগৎ সৃষ্টির নির্দিষ্ট ক্রম : ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্রহ্ম হতে জগৎ সৃষ্টির ক্রম নিম্নরূপ। প্রথমে ব্রহ্ম হতে আকাশের আবির্ভাব হয় এবং তারপর ক্রমে ক্রমে বায়ু, অগ্নি, অপ ও ক্ষিপ্তির আবির্ভাব হয়। এগুলোকে বলা হয় পঞ্চতন্মাত্র। এ পঞ্চতন্মাত্রের পাঁচ প্রকার সংমিশ্রণ হতে পঞ্চ মহাভূতের সৃষ্টি হয়। যেমন- আকাশ মহাভূতের সৃষ্টি হয় অর্ধাংশ আকাশ তন্মাত্র, এক-অষ্টাংশ বায়ু তন্মাত্র, এক-অষ্টাংশ অগ্নি তন্মাত্র, এক-অষ্টাংশ অপ তন্মাত্র ও এক-অষ্টাংশ ক্ষিপ্তি তন্মাত্রের সংমিশ্রণে ফলে। অপর মহাভূতগুলোর উৎপত্তি ঠিক একইভাবে সংগঠিত হয়। পঞ্চতন্মাত্রের এরূপ সংমিশ্রণকে বলা হয় পঞ্চীকরণ । মানুষের স্থূল দেহ এবং সমস্ত স্থুল দ্রব্য এ পাঁচটি মহাভুতের দ্বারা গঠিত।
রামানুজ কর্তৃক শঙ্করের মায়াবাদ খণ্ডন : রামানুজ শঙ্করের মায়াবাদের তীব্র ও পুঙ্খানুপুঙ্খ সমালোচনা করেন। শঙ্করের মায়াবাদের বিরুদ্ধে রামানুজ সাতটি আপত্তি উত্থাপন করেছেন যা সপ্তানুপত্তি নামে খ্যাত।
প্রথমত, শঙ্করের মতে, মায়া সৎও নয় অসৎও নয়। কিন্তু রামানুজ বলেছেন, ব্যক্তি মাত্রই হয় সৎ না হয় অসৎ হবে। সৎ এবং অসৎ স্ববিরোধী। স্ববিরোধী দুটি গুণ কারো বেলায় একই সময়ে একই অর্থে সত্যও হতে পারে না, আবার মিথ্যাও হতে পারে না। তাই যদি হয়, মায়া সৎও নয় এবং অসৎও নয়। কিন্তু কেমন করে হয়? অতএব মায়ার স্বরূপ অসিদ্ধ। তাই একে স্বরূপ অনুপপত্তি বলা হয়।
দ্বিতীয়ত, শঙ্করের মতে, মায়া ব্রহ্মের একরকম শক্তি এবং এটি অবর্ণনীয়। এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রামানুজ বলেছেন, মায়া যদি ব্রহ্মের শক্তি হয়, তবে ব্রহ্মকে আশ্রয় করে মায়া অবস্থান করে। মায়া হলো অজ্ঞানতাস্বরূপ ব্যাঘাত ঘটে এবং ব্রহ্ম আর সর্বজ্ঞ থাকে না। অতএব জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মে অজ্ঞানস্বরূপ মায়ার আশ্রয়ের জন্য এখানে আশ্রয়ানুপপত্তি ঘটেছে।
তৃতীয়ত, শঙ্করের মতে, মায়া বা অবিদ্যা হলো অনাদি এবং অনন্ত। রামানুজের মতে, শঙ্কর ব্রহ্মের বাইরে মায়ারূপকোন শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন এবং এতে শঙ্করের অদ্বৈতবাদ দ্বৈতবাদে পরিণত হয়েছে।
চতুর্থত, শঙ্কর বলেছেন, এ জগৎ মায়ারই সৃষ্টি এবং মায়া জীবকে আশ্রয় করে অবস্থান করে। কিন্তু রামানুজ বলেছেন, জীব যেহেতু মায়ার সৃষ্টি সেহেতু মায়া জীবকে আশ্রয় করে অবস্থান করতে পারে না। জীব যদি মায়ার সৃষ্টি হয় তবে মায়া কারণ এবং জীব কার্য এবং কারণ কোন সময় কার্যের উপর নির্ভর করতে পারে না।
পঞ্চমত, শঙ্করের মতে, মায়া ব্রহ্মকে আবৃত করে রাখে। এর প্রেক্ষিতে রামানুজ বলেছেন, মায়া ব্রহ্মকে আবৃত করতে পারে না। ব্রহ্ম স্বয়ং প্রকাশমান এবং চির প্রকাশমান। ব্রহ্মকে আবৃত করা সম্ভব হলে ব্রহ্ম অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে।
ষষ্ঠত, শঙ্করের মতে, মায়া হলো অবিদ্যা বা অজ্ঞান। কিন্তু রামানুজ বলেছেন, মায়া যদি অজ্ঞান বা অবিদ্যা হয়, তবে ব্রহ্মকে লুকিয়ে রাখা রূপ ক্রিয়া করে কেমন করে? কারণ, অবিদ্যা বা অজ্ঞান জ্ঞানের অভাব বলে স্বীকৃত। আর অভাব পদার্থের কোন ক্রিয়া থাকা সম্ভব নয়।
সপ্তমত, তর্কের খাতিরে মায়াকে যদি বাস্তবও মনে করি, তবে ব্রহ্ম জ্ঞানে তা নষ্ট হয়ে যায় কেমন করে? অস্তিত্বশীল কোন বস্তুত জ্ঞানের দ্বারা বিনষ্ট হতে পারে না। রামানুজের মতে, মায়া ব্রহ্মের অচিৎ শক্তি এবং ব্রহ্মের অংশ।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, শঙ্কর নিজেও মায়া সম্পর্কে কোন বুদ্ধিগত ধারণার কথা বলেন নি। মায়া সম্পর্কে কোন ধারণা করা সম্ভব নয়। কারণ অনুরূপ বস্তু সম্পর্কে কোন প্রমাণ সম্ভব নয়। রামানুজ নিজেও বলেছেন, মায়া সম্পর্কে সম্ভাব্য কোন প্রমাণ সম্ভব নয়।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b6-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!