অথবা, উপনিষদকে বেদান্ত বলার কারণ আলোচনা কর।
অথবা, উপনিষদকে বেদান্ত বলার কারণ কী?
অথবা, উপনিষদকে বেদান্ত দর্শন বলার কারণ কী?
উত্তর৷ ভূমিকা :
ভারতীয় দর্শনে আস্তিক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বেদান্ত দর্শন অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাচীন বৈদিক দর্শনের অধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারা বেদান্ত দর্শনে পূর্ণতা লাভের প্রয়াস পায়। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বেদান্ত দর্শনে ভারতীয় দর্শনের সমগ্র ঐতিহ্যটির উপস্থাপনা করে। ব্রহ্মসূত্র এবং এটির ভাষ্যসমূহে ভারতীয় প্রায় সমস্ত সম্প্রদায়ের দার্শনিক মতামত উল্লেখ করা হয়। নিম্নে প্রশ্নের আলোকে আমাদের আলোচ্যবিষয় আলোচনা করা হলো :
উপরিষদকে বেদান্ত বলার কারণ : উপনিষদে বেদের গূঢ় তাৎপর্য নিহিত আছে। উপনিষদের অর্থ হলো অরণ্যে নিভৃতে গুরুর সমীপে উপবিষ্ট হয়ে শিষ্য যে জ্ঞান লাভ করে, যে গ্রন্থ পাঠে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করা যায় তাকে উপনিষদ বলা হয়। শঙ্করাচার্য বলেন, যে শাস্ত্র পাঠ করলে অবিদ্যা দূর হয় তাই উপনিষদ। উপনিষদ পাঠ করলে পাঠকের মনকে ব্রহ্মের
দিকে উদ্দীপিত করে আস্তে আস্তে চরম সত্যের দিকে পৌঁছাতে সাহায্য করে। পরিভাষা অনুসারে বেদের শেষাংশকে ‘বেদান্ত’ বলা হয়। পূর্বে উপনিষদকে বেদান্ত নামে বলা হতো। কারণ উপনিষদের প্রমাণকেই বেদান্ত বলা হয় । উপনিষদকে বেদান্ত বলার কারণগুলো নিম্নে আলোচিত হলো :
প্রথমত, বৈদিক সাহিত্যের শেষাংশ উপনিষদ। বেদের যে চারটি স্তর- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ নামে উল্লিখিত হয় তার সর্বশেষ স্তর উপনিষদ কেবলমাত্র দার্শনিক সমস্যার যাবতীয় ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন বিষয়ক আলেখ্য নামে পরিচিত। এদিক থেকে বেদের শেষাংশ উপনিষদকে বেদান্ত বলা হয়।
দ্বিতীয়ত, বেদ অধ্যয়নের রীতি অনুসারে উপনিষদ সর্বশেষ আচরণীয় শাস্ত্র হিসেবে গণ্য। আর্যগণ তাঁদের সমগ্র জীবৎকালকে চারটি স্তরে ভাগ করেছেন। সর্বশেষ স্তর সন্ন্যাস নামে উল্লিখিত। বেদের শেষাংশের মধ্যে যাবতীয় তাত্ত্বিক ও দার্শনিক সমস্যাগুলোর যুক্তিবদ্ধ আলোচনা বিদ্যমান। আর্যদের জীবনের শেষ স্তর বা সন্ন্যাস জীবনে পাঠ্য হিসেবে উপনিষদকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। জীবনের শেষ স্তরে বেদের শেষাংশ পাঠ্য হওয়ায় উপনিষদকে বেদান্ত বলা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, বৈদিক চিন্তার যাবতীয় সুসংহত পরিণতি তার দার্শনিক চিন্তাধারার মধ্যে নিহিত। একেই উপনিষদ বলা হয়। তাই চিন্তনের পরিণতি বা সর্বশেষ চিন্তন মণ্ডিত অবস্থাকে বেদান্ত বলা সমর্থনযোগ্য।
চতুর্থত, নিগূঢ় তত্ত্বের সুবোধ্য নিভৃত আলোচনাকে উপনিষদ বলা হয়। কারণ বেদান্ত তত্ত্বসমূহ সুনির্বাচিত শিক্ষার্থীকে
গোপনীয়ভাবে শিক্ষা দেয়া হতো। শিক্ষার্থীদের অনধিগম্য বিষয়গুলো গুরু স্বয়ং সমীপবর্তী শিক্ষার্থীগণের সম্মুখে অন্তির্নিহিত তাৎপর্য ব্যাখ্যা দ্বারা তাঁদের ‘পরমতত্ত্ব’ জ্ঞানে উত্তরণের সহায়ক হতেন। অর্থাৎ সমীপবর্তীগণের পরমতত্ত্ব সমীপবর্তী হওয়ার মাধ্যম হিসেবে উপনিষদকে আন্তঃজ্ঞান সহায়ক। এদিক থেকে উপনিষদকে বেদান্ত বলা সঙ্গত।
উপসংহার : পরিশেষে আমরা বলতে পারি, বেদান্ত দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস অত্যন্ত সুদীর্ঘ ও প্রাচীন। এ বেদান্ত দর্শনেই প্রাচীন বৈদিক দর্শনের অধ্যাত্মবাদী ভাবধারা পূর্ণতা লাভ করেছে। বেদান্ত দর্শন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমগ্র ভারতীয় দর্শনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b6-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!