অথবা, প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণ সম্পর্কে গাজালির নিজস্ব যুক্তি কী? তিনি এ সম্পর্কে দার্শনিকদের যুক্তি কিভাবে খণ্ডন করেন তা ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন কর।
অথবা, ইমাম আল গাজালি প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণ সম্পর্কে দার্শনিকদের যুক্তি কিভাবে খণ্ডন করেন আলোচনা কর।
অথবা, ইমাম আল-গাজালি প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণ সম্পর্কে দার্শনিকদের যুক্তি কিভাবে খণ্ডন করেন বিশ্লেষণ কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
ইমাম আল গাজালি ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী, অসাধারণ মেধাবী ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানপিপাসু সাধক পুরুষ। সুনিশ্চিত সত্য আবিষ্কারের জন্য তিনি অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা অতিক্রম করেছেন। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ এবং সমাজসংস্কারকও ছিলেন। তিনি প্রাকৃতিক ও কার্যকারণ নিয়মকে কোন আবশ্যিক নিয়ম বলে মানতে রাজি নন। প্রকৃতির নিয়মকে অনেক দার্শনিক বিশ্বাস করেন না। এসব দার্শনিকদের মতবাদ খণ্ডন করার জন্য ইমাম আল গাজালি বদ্ধপরিকর।
প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণ সম্পর্কে দার্শনিকদের যুক্তি ও গাজালির খণ্ডন : দার্শনিকদের যুক্তিসমূহকে গাজালি তিন ভাগে ভাগ করে সেগুলোকে খণ্ডন করেছেন। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো :
দার্শনিকদের প্রথম যুক্তি : দার্শনিকরা মনে করেন, আগুন যে বিশেষ অবস্থায় অতীতে দহন করেছে, বর্তমানেও করে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এটা ইচ্ছাকৃত কোন কাজ। আগুনকে দহনকার্য থেকে বিরত রাখা কখনো সম্ভব নয়।
আল গাজালির খণ্ডন : আল গাজালি দার্শনিকদের প্রথম যুক্তির খণ্ডন করে বলেন, দার্শনিকদের এ যুক্তির কোন ভিত্তি নেই। তিনি মনে করেন, দার্শনিকদের কাছে এমন কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই যে, আগুনের সংযোগ ঘটলে অবশ্যই দহনকার্য সংঘটিত হবে। অতীতে যে দহনকার্য সংঘটিত হয়েছে, বর্তমানে হয় এবং ভবিষ্যতেও হবে- এটা কোন সুনির্দিষ্ট নিয়ম নয়। এটা হলো একটা অবশ্যম্ভাবী ধারণা। কিন্তু আল গাজালি বলেন, পরম করুণাময় আল্লাহ আগুনের মধ্যে দহনক্রিয়ার শক্তি প্রদান করেন। আগুনের নিজস্ব কোন গুণ নেই অর্থাৎ আগুনের নিজের মধ্যে কখনো এ গুণ আপনা আপনি আসে না।
আগুনের মধ্যে যে দহনকার্য সংঘটিত হবে তার নিশ্চয়তা কখনো দেয়া যায় না। সুতরাং কার্য ও কারণের মধ্যে কোন আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। প্রকৃতির নিয়মেই যে সব হবে তা বলা যায় না। এর থেকে ভিন্ন কিছুও হতে পারে।
দার্শনিকদের দ্বিতীয় যুক্তি : দার্শনিকরা মনে করেন, আদি উৎস থেকে বস্তুসমূহ তাদের গুণ পেয়ে থাকে। সূর্য থেকে যেমন সূর্যকিরণ পাওয়া যায় তেমনি আদি উৎস থেকে বস্তুগুলোর গুণাবলি পাওয়া যাবে। আগুনের গুণ আদি উৎস থেকে পাওয়া যায়। কেননা আগুন অতীতে দহন করেছে, বর্তমানে করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। দার্শনিকরা তাদের ধারণার উপর ভিত্তি করে নবী রাসূলগণের মোজেজাকে স্বীকার করেন না।
ইমাম আল গাজালির খণ্ডন : ইমাম আল গাজালি দার্শনিকদের দ্বিতীয় যুক্তিকে নিম্নলিখিতভাবে খণ্ডন করেন :
প্রথমত, পরম করুণাময় আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার মালিক। তিনি আমাদের জ্ঞান দান করেছেন। তিনি আমাদের জ্ঞান দান না করলে আমরা প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণ সম্পর্কে কিছু জানতে পারতাম না। কিন্তু গাজালি কখনো স্বীকার করেন না যে, ব্যতিক্রম হবেই। তিনি শুধু বলেন যে, ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
দ্বিতীয়ত, পরম করুণাময় কর্তৃক কোন বিষয়ের জ্ঞান তাঁর ফেরেশতার মাধ্যমে পরিবর্তন করে থাকেন। তিনি হয়ত কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এমন পরিবর্তন করে থাকেন। তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর ক্ষমতার বাইরে কোন কার্য সংঘটিত হতে পারে না।
তৃতীয়ত, দার্শনিকরা বলেন, পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা কখনো কোনকিছুর ব্যতিক্রম ঘটাতে পারেন না। কিন্তু উত্তরে গাজালি বলেন, আল্লাহ তায়ালা ব্যতিক্রম ঘট াতে পারেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহতায়ালা সবসময় ব্যতিক্রম ঘটাতেই থাকবেন।
দার্শনিকদের তৃতীয় যুক্তি : দার্শনিকরা মনে করেন যে, প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনা ও বস্তু স্বতন্ত্র প্রকৃতির। একটি থেকে.অপরটি সম্পূর্ণ আলাদা। তাই প্রকৃতিতে যেসব ঘটনা ঘটে তার কোন ব্যতিক্রম হবে না। যেমন- আগুনের কার্য দহন করা। এর ব্যতিক্রম কখনো হবে না। দার্শনিকদের মতে, এক বস্তু অন্য বস্তুতে রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু বস্তুর মৌলিক
গুণাবলি একই থাকে।
আল গাজালির খণ্ডন : আল গাজালি দার্শনিকদের তৃতীয় যুক্তিকে নিম্নলিখিতভাবে খণ্ডন করেছেন :.
প্রাথমত, দার্শনিকরা দেখাতে চান যে, মৃত্তিকা থেকে প্রাণের উদ্ভব হয়। তবে লাঠি সাপে পরিণত হয় ফুঁ দেয়া মাত্র। এটাকে কখনো বিশ্বাস করা যায় না। এটি একটি অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস। উত্তরে গাজালি বলেন, বিশ্বের সমস্ত ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন । সাধারণত মানুষের কাছে যেটা করা অসম্ভব আল্লাহতায়ালার কাছে সেটা খুবই সহজ।
দ্বিতীয়ত, দার্শনিকরা বস্তুর রূপান্তর নীতির কথা বলেছেন। এ নীতিকে স্বীকার করে আল গাজালি বলেন, মাটি থেকে যদি প্রাণের উদ্ভব হয় তাহলে মৃত ব্যক্তি জীবিত হবে না কেন? তাদের অবশ্যই এটা স্বীকার করে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, পরস্পর বিপরীত বিষয় দার্শনিকরা সম্ভব নয় বলেছেন। ফলে একই সময় একই বিষয় অস্তিত্বহীন ও অস্তি ত্বশীল হওয়া কখনো সম্ভব নয়। তাতে করে লাঠি সাপ হওয়া অসম্ভব প্রমাণিত হয় না। এটা প্রমাণিত হয় যে, একই সময়ে লাঠির পক্ষে সাপ হওয়া ও না হওয়া যে কোন একটি বুঝায়।
মূল্যায়ন : দার্শনিকরা প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণকে স্বীকার করে এর আবশ্যিকতাকেও স্বীকার করেন। কিন্তু গাজালি প্রাকৃকি নিয়ম ও কার্যকারণকে স্বীকার করলেও এর আবশ্যিকতাকে অস্বীকার করেন। এ বিষয়ে গাজালি খুবই
সন্দেহ প্রকাশ করেন । তাই গাজালির এ অভিযোগকে গুরুত্বহীন ভাবার কোন অবকাশ নেই।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, আল গাজালি স্পষ্ট বলেন আল্লাহর পক্ষে কোনকিছু অসম্ভব নয়। তার ইচ্ছায় এর ব্যতিক্রমও হতে পারে। প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণ নীতি সম্পর্কে দার্শনিকদের যুক্তির যে প্রতিবাদ করেছেন তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%9a%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!