অথবা, রাজনৈতিক তত্ত্বে গাজালির অবদান আলোচনা কর।
অথবা, ইমাম আল-গাজালির রাষ্ট্রদর্শন ব্যাখ্যা কর।
অথবা, রাজনৈতিক তত্ত্বে গাজালির অবদান সম্পর্কে যা জান বিস্তারিত লেখ।
অথবা, রাজনৈতিক তত্ত্বে গাজালি কী কী অবদান রেখেছেন বর্ণনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা
: ইমাম আবু হামিদ ইবনে আল-গাজালি ১০৫৮ সালে খোরাসানের তুস নগরের নিকটবর্তী গাজালি পল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিযামীয়ার অধ্যক্ষ ইমামুল হারমানের নিকট ধর্মশাস্ত্র, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তিনি ইসলামের বিভিন্ন শাখায় বিস্ময়কর ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ছোট বড় ৭০ খানা গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘ইয়াহ্ ইয়া-উল-উলুম আদদীন’, ‘তাহা-ফাতুল-ফালাসিফা’, ‘তীবরুল মাসবুক’, মিসকাতুল আনোয়ার’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান হল ‘ইয়াহ্ ইয়া-উল-উলুম আদদীন’ ।
রাজনৈতিক তত্ত্বে গাজালির অবদান : আল-গাজালির রাষ্ট্রচিন্তা ইসলামের প্রভাব প্রবল হলেও রাষ্ট্রতত্ত্ব বিশ্লেষণে তিনি যে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও মতামত ব্যক্ত করেছেন তার গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। রাষ্ট্রতত্ত্বকে বিজ্ঞানের সমপর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। রাষ্ট্রতত্ত্বে তাঁর অবদানের বিভিন্ন দিক নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
১. রাষ্ট্রের উৎপত্তি : গাজালি বলেছেন, প্রথমত, আল্লাহ মানবজাতিকে সামাজিক জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ফলে মানুষ একে অপরের সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করে। দ্বিতীয়ত, খাদ্যবস্ত্রের অভাব মিটানোর জন্য একে অপরের সহযোগিতা কামনা করে। অপরপক্ষে, মানুষ সংঘবদ্ধ ছাড়া চলতে পারে না, তাই মানুষ এক সাথে বসবাস করে। আর
এভাবেই সমাজ জীবন গড়ে উঠে। অপরদিকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শত্রু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ প্রাচীর বেষ্টিত ঘন সন্নিবদ্ধ গৃহাদি নির্মাণ করে। আর এভাবেই নগর গড়ে উঠে। আবার মানুষ যেহেতু এক জায়গায় থাকলে সংঘাত লাগতে পারে তাই নিরাপত্তার জন্য আইনের শাসন ও সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। আর এভাবেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি।
২. রাষ্ট্র ও আইন : গাজালি বলেছেন, মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সুষ্ঠু জীবনযাপন ও সমাজ পরিচালনার জন্য আইন এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজন রয়েছে। তাই তিনি বলেছেন, আইনকানুন একজনের উপর আরেকজনের অন্যায় হস্তক্ষেপকে বাধা দেয় এবং সফলের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করে। আর রাষ্ট্রই কেবলমাত্র আইনকানুনকে সফলের জন্য কার্যকরী করতে পারে।
৩. গুপ্তচর প্রথা : গাজালির মতে, রাষ্ট্র প্রথার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হচ্ছে গুপ্তচর প্রথা। তাঁর মতে, রাষ্ট্রেরই গুপ্তচর প্রথা থাকা অতি আবশ্যক। কারণ গুপ্তচর প্রথার মাধ্যমেই একটি দেশের শাসক জানতে পারে অন্য রাষ্ট্র
তাঁর নিজের দেশ সম্পর্কে কি ধরনের ষড়যন্ত্র বা চিন্তাভাবনা করছে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গুপ্তচর বাহিনীর মাধ্যমে দেশের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হয়ে সে অনুযায়ী নীতিনির্ধারণ করতে পারে।
৪. অর্থনীতি ও কর : গাজালির মতে, “অর্থনীতির সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমেই মানুষের অভাবের সমন্বয় সাধন করাই সর্বোত্তম।” তাই তিনি Revenue ও Expenditure এর উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর মতে, এমনভাবে করারোপ করতে হবে যাতে কর প্রদানকারী বুঝতে না পারে যে, করারোপ তাঁর উপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫. নাগরিক বিভাগ ও দাস প্রথা : গাজালি নাগরিক শ্রেণীকে চার ভাগে ভাগ করেছেন। যথা : ১. কৃষক ২. শিল্প ও কারিগর; ৩. যোদ্ধা ও ৪. মৎস্যজীবী। তিনি গ্রিক দার্শনিকদের ন্যায় শ্রেণীগত অসাম্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের কাঠামো রচনা করেন নি। ‘সকলেই সমান’ এটাই তাঁর মূলকথা। দাস প্রথাও তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, “ইসলামে দাস অদা স সবাই সমান।” অতএব তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। প্লেটো এবং এরিস্টটল যেমন দাসদের.সজীব হাতিয়ার মনে করতেন, কিন্তু গাজালি তা না করে তাদেরকে নাগরিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
৬. প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ : গাজালি মনে করেন যে, রাষ্ট্রের বিশাল আয়তনের দিকে নজর রেখে সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ একান্ত দরকার। তাঁর মতে, কেন্দ্রের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকলে শাসক স্বৈরাচারী হয়ে যায়।
মূল্যায়ন : আল বিরুনি তাঁর ‘আল আছর’ গ্রন্থের সম্পাদককে বলেছেন, “গাজালি ও আশারি জন্মগ্রহণ না করলে.আরবগণ গ্যালিলিও, কেপলার ও নিউটন প্রমুখ মনীষীর সম্মানিত জাতিতে পরিণত হতো। অনেক সমালোচক বলেছেন, গাজালি সমাজ বিধ্বংসী অবাধ স্বাধীন চিন্তাধারার স্রোত রোধকল্পে মহানবী (স) এর স্বীকৃতি ইজতেহাদকে বন্ধ করে দিয়ে ইসলামকে চলিষ্ণু করার পথে এক বাঁধার সৃষ্টি করেছেন। তাই হিট্টি বলেছেন, “গাজালি ইসলামের জন্য এমন একটি সেল তৈরি করেছেন যেখানে ইসলামের সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান আরোহণ আটক পড়েছে।” কিন্তু অনেক পণ্ডিত তাঁর দর্শন ও বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা স্বীকার করেন। De Boes এর মতে, “গাজালি নিঃসন্দেহে মুসলিম জনগণের শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক।” গাজালির সমস্ত অবদানের কথা স্বীকার করে M. Watt বলেছেন, “গাজালি হযরত মুহম্মদ (স) এর পরে শ্রেষ্ঠ মনীষী।” তাই আমরা বলতে পারি যে, মুসলিম ধর্মতত্ত্বের সংস্কার সাধনে তাঁর অবদান যুগ ও কালের পরিবর্তন সত্ত্বেও অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে একটা বিষয় স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান যে, আল-গাজালি তার গভীর ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞান এবং নিখুঁত যুক্তি ও সুখবোধ্য লেখনীর মাধ্যমে ইসলাম ও দর্শন উভয়কেই একটা শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি সকল অনৈসলামিক চিন্তাধারার প্রভাব থেকে মুক্ত করে ইসলামকে অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তার এসব অবদানের জন্য তিনি ইসলামে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%9a%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!