অথবা, পাশ্চাত্য দার্শনিক ডেকার্ট, ইমানুয়েল কান্ট ও বার্গসোঁর সাথে ইবনে সিনার তুলনামূলক আলোচনা কর।
অথবা, ইবনে সিনার সাথে ডেকার্ট, ইমানুয়েল কান্ট ও বার্গসোঁর তুলনামূলক বর্ণনা কর।
অথবা, পাশ্চাত্য দার্শনিক ডেকার্ট, ইমানুয়েল কান্ট ও বার্গসোর সাথে ইবনে সিনার দর্শনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ইবনে সিনা তাঁর মনের গভীরতা, চিন্তাশক্তির প্রখরতা ও বিশ্বজনীন উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বিশ্বের সুধী সমাজে বিশেষভাবে সুপরিচিত। তিনি এরিস্টটলের দর্শনের একজন সফল ভাষ্যকার। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় মুসলিম বিশ্বে এরিস্টটলের দর্শন চর্চা বিশেষভাবে প্রসারিত হয়। মুসলিম
দর্শনে আল-ফারাবি যে নব্য প্লেটোবাদী ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সে ঐতিহ্যের প্রাচ্যদেশীয় শ্রেষ্ঠতম প্রবক্তা ও ব্যাখ্যাকারী ছিলেন ইবনে সিনা। সমসাময়িক এমনকি পরবর্তীকালে পাঠক ও বিদগ্ধ সমাজে তাঁর মতাবলি সমর্থিত হয়েছিল বর্ণনার স্বতঃস্ফূর্ত এবং রচনার গুণগতমানের উৎকৃষ্টতার জন্য ।
ইবনে সিনার পরিচয় : ইবনে সিনার পুরো নাম আবু আলী আল হুসায়ন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। ল্যাটিন ভাষায় তিনি আবি সিনা (Avicenna) এবং হিব্রুতে আবেন সিনা (Avensina) নামে পরিচিত। তিনি একাধারে দার্শনিক, চিকিৎসক গাণিতিক, ও জ্যোতির্বিদ ছিলেন। কোত্তরটয়িস তাঁর ‘আবি সিনা দি প্রিন্স অব দ্যা লারনেড’ বইতে বলেছেন,
তিনি মুসলিম বিশ্বে একজন সুবিখ্যাত বিজ্ঞানী, প্রাচ্য জগতে তিনি যথার্থভাবে ‘আল শায়খ আল রাইস’ বা প্রধান শায়খ নামে পরিচিত। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থাবলির বিবরণ হতে যা জানা যায়, তা হলো তিনি বুখারার কাছাকাছি উত্তর পারস্যের খার মাইমান নামক একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আবদুল্লাহ নাতিখীর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ইবনে সিনার মানসিক বৃত্তি এত দ্রুত স্ফুরণ ঘটতে থাকে যে, অতি অল্প সময়ে তিনি তাঁর শিক্ষককে ছাড়িয়ে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনি অল্প সময়েই ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও স্বাধীন চিন্তার জন্য নানাভাবে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের স্বীকার হন। অবশেষে ১০৩৭ সালে ৫৮ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইবনে সিনা ও পাশ্চাত্য দার্শনিকগণ : ইবনে সিনা একজন উল্লেখযোগ্য মুসলিম চিন্তাবিদ, তিনি দর্শনশাস্ত্রে যে শ্রেণীবিন্যাস করেন, তা মধ্যযুগের ইউরোপীয় দর্শনে বহুল পরিমাণে অনুসৃত হয়েছিল। ইহুদি দার্শনিক, মায়ামোদি তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। ইবনে সিনা সম্পর্কে একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক অধ্যাপক জে, এল টেচার লক্ষ্য করেছেন, ইবনে সিনার অধিবিদ্যার এমন কতকগুলো দিক ছিল, যা আধুনিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ কতকগুলো মতবাদের পূর্বাভাস। তিনি আরও বলেছেন, এ দু’টি সময়ে মূল যে পার্থক্য তা হলো পরিভাষাগত, তবে তা নীতিগত বা
পদ্ধতিগত নয়। আর এ দৃষ্টিকোণ হতে ডেকার্ট, কান্ট ও বার্গসোঁর দর্শনের সাথে তাঁর মতের যথেষ্ট মিল পরিলক্ষিত হয়।
নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচিত হলো :
ইবনে সিনা ও ডেকার্ট : আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জনক হলেন ডেকার্ট। তাঁর আলোচ্যবিষয়গুলো ইবনে সিনা কর্তৃক পূর্বেই অস্পষ্ট ও প্রচ্ছন্নভাবে আলোচিত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচিত হলো :
ডেকার্টের দর্শনের মূল নীতি : ডেকার্টের দর্শনের মূলনীতি নিম্নরূপ :
১. ডেকার্ট পদ্ধতিগত সংশয়ের কথা বলেছেন।
২. আমি চিন্তা করি, সুতরাং আমি অস্তিত্বশীল’ নীতিটি স্বজ্ঞাগত নিশ্চয়তা।
৩. আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে তত্ত্বগত ধারণা, যা তার সত্তার অস্তিত্বকে নিশ্চিত বলে দাবি করে।
আমরা যদি ইবনে সিনার দর্শন আলোচনা করি, তাহলে ডেকার্টের এসব ধারণাবলির সমর্থ ন খুঁজে পাব। ইবনে সিনার মতবাদের মধ্যে ডেকার্টের এসব বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে ছিল।
ইবনে সিনা ও কান্ট : কান্ট ছিলেন এমন একজন আধুনিক দার্শনিক, যিনি আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাধারাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। তিনি বুদ্ধিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের সমন্বয় সাধন করেছিলেন। আমরা দেখি যে, কান্ট বিশুদ্ধ প্রজ্ঞা ও ব্যবহারিক প্রজ্ঞার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। কান্টও Pure Reason ও Practical Reason এর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। তাছাড়া বিশুদ্ধ প্রজ্ঞার মধ্যে রয়েছে বিরোধিতা বা এন্টিনমি (Antinomy)। কান্ট চার ধরনের
এন্টিনমির কথা বলেছেন, যা ইবনে সিনার মতবাদের পূর্বাভাস বলা চলে, সেগুলো হলো :
ক. পৃথিবী চিরন্তন ও সৃষ্ট উভয়ই। এখানে তিনি বুদ্ধিবাদ ও ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেন। বস্তু বিভাজ্য না অবিভাজ্য এ বিরোধিতার ক্ষেত্রে ইবনে সিনা বস্তুর অনন্ত অবিভাজ্যতার কথা স্বীকার করেন। এ দিক দিয়েও তাঁর মতের মধ্যে কান্টের মতবাদের পূর্বাভাস পরিলক্ষিত হয়।
খ.কান্টের মতে, আল্লাহর অস্তিত্ব অবশ্যই আছে। তাছাড়া কার্যকারণ শৃঙ্খল অনিশ্চিতভাবে নিতে পারে না, এটি
গ.আদি কারণে গিয়ে শেষ হয়, যেখানে আমরা কারণের আর কারণ খুঁজে পাই না। অর্থাৎ, কার্যকারণের মাধ্যমে পরমসত্তা সম্পর্কে জানা যায়।
ঘ. চতুর্থ বিরোধিতা হলো জগতের প্রকৃতি সম্ভাব্য ও নিশ্চয়াত্মক। ইবনে সিনা তাঁর অধিবিদ্যা বা বিশ্বতাত্ত্বিক আলোচনায় এরূপ কথা বলেছেন। তিনি সত্তার আলোচনায় দু’ধরনের সত্তার কথা বলেছেন। যথা : সম্ভাব্য সত্তা ও নিশ্চয়াত্মক সত্তা।
ইবনে সিনা ও বার্গসো : এম সাঈদ শেখ তাঁর ‘Muslim Philosophy’ গ্রন্থে বলেছেন, “আমরা যদি তাঁর দর্শনের সাথে আধুনিক চিন্তার সাদৃশ্য খুঁজি, তাহলে সহজেই আমরা বাগসোঁর মতের সাথে মিল খুঁজে পাব।’ অর্থাৎ, ইবনে সিনার বিবর্তনবাদের মধ্যে বার্গসোঁর সৃজনমূলক বিবর্তনবাদের পূর্বাভাস পরিলক্ষিত হয়। ইবনে সিনা বলেছেন, ইশকের
আকর্ষণে বিশ্বজগৎ নব নব সৃষ্টির পথে ছুটে চলছে নিম্নস্তর হতে উচ্চস্তরে। ক্রমবিকাশের ঊর্ধ্বগতি ইবনে সিনার বিবর্তন প্রক্রিয়াকে বুদ্ধিগত রূপ দিয়েছেন। আমরা দেখি যে, বার্গসোঁর সৃষ্টি প্রক্রিয়ার প্রত্যেক স্তরে নব নব সৃষ্টি পথে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু ইবনে সিনার বিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পৰ্কীয় মতবাদ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, তা অনেকাংশে অপেক্ষাকৃত বেশ সুনিয়ন্ত্রিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু তাই নয়, তাঁর বিবর্তনবাদী মতবাদের সাথে মর্গান ও সামুয়েল আলেকজান্ডারের উন্মেষমূলক বিবর্তনবাদের সাথে মূলত তুলনা করা যেতে পারে।
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার শেষে বলা যায় যে, ইবনে সিনা ইউক্লিডীয় জ্যামিতিকে আরবি ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেন এবং এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যা, তত্ত্ববিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার নতুনতর বিকাশ সাধন করেন। তাঁর দর্শনে আমরা ভাববাদ ও বস্তুবাদ উভয় ধারণাই পাই। তিনি গতি, শূন্যতা, তাপ, আলো, স্থানিক আকর্ষণ প্রভৃতি ক্ষেত্র গবেষণা করেন।
সে যুগে প্রচলিত আলকেমি বিদ্যার ধাতু রূপান্তরবাদকে তিনি স্বীকার করেন। ইবনে সিনা শুধু তাঁর যুগের চিন্তাধারার অগ্রদূত ছিলেন না, বরং তাঁর দার্শনিক মতবাদ অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক দর্শনসহ পরবর্তী দার্শনিক ঐতিহ্যের পূর্বাভাস। মূলত মুসলিম প্রাচ্যে আল-গাজালি পূর্ববর্তী চিন্তাবিদ তাঁর মত এত অধিক জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হতে পারেন নি।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%a4%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%be/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!