অথবা, সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে আল গাজালির মতবাদ ব্যাখ্যা কর। তিনি কিভাবে নির্গমন তত্ত্বের সমালোচনা করেন?
অথবা, সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে আল গাজালি কী বলেছেন? নির্গমনতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর সমালোচনা উল্লেখ কর।
অথবা, সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে আল গাজালির মতবাদ বর্ণনা কর। তিনি কিভাবে নির্গমন তত্ত্বের সমালোচনা করেন?
উত্তর৷ ভূমিকা : একুশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের যে কয়জন মুসলিম চিন্তাবিদের আবির্ভাব ঘটে তাদের মধ্যে আল গাজালির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জ্ঞানের গভীরতায় এবং চিন্তার মৌলিকতায় বিশ্ব ইতিহাসে আল গাজালির নাম চিরস্মরণীয়। তবে ফালাসিফা সম্প্রদায়ের মুসলিম দার্শনিকরা খোদাকে সবকিছুর উৎস মনে করলেও তাঁকে স্রষ্টা বলে বিবেচনা করেন না। কিন্তু আল গাজালি প্রমুখ মুসলিম দার্শনিকরা এই ধারণাকে সম্পূর্ণ শরীয়তপন্থী বলে চিহ্নিত করেন। গাজালি ফালাসিফা সম্প্রদায়ের দার্শনিকদের নির্গমনতত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করে সৃষ্টিতত্ত্ব প্রবর্তন করেন।
আল গাজালির সৃষ্টিতত্ত্ব : আল্লাহ কর্তৃক জগৎ সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে মুসলিম দর্শনে সৃষ্টিতত্ত্ব বলা হয়ে থাকে। এই সৃষ্টিতত্ত্বের অনুসারী হলেন ইমাম আল গাজালি। তাঁর মতে, এমনিতেই জগৎ সৃষ্টি হয়। এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন পরম
করুণাময় আল্লাহ তায়ালা। নিম্নে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. আল্লাহর ইচ্ছায় জগৎ সৃষ্টি : ইমাম আল গাজালির মতে, এই জগতের সৃষ্টিকর্তা হচ্ছে আল্লাহ। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও দয়ালু। তিনি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছা পোষণ করেন তখনই হয়ে যায়। তাঁর ইচ্ছায় এই জগতের সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে । তিনিই হলেন স্রষ্টা।
২. জগতের সবকিছু সসীম : ইমাম আল গাজালির মতে, জগতের সবকিছুই সসীম, অসীম নয়। এই জগৎ সসীম সত্তার সমন্বয়ে গঠিত। আল্লাহ হচ্ছে অসীম। এই পরম করুণাময় আল্লাহ হচ্ছেন একমাত্র অসীম, যিনি জগতের সকল সসীম সত্তার স্রষ্টা।
৩. বিশ্বজগৎ চিরন্তন নয় : গাজালি মনে করেন, বিশ্বজগৎ কখনো চিরন্তন নয়। কেননা চিরন্তন সত্তা কখনো একাধিক হতে পারে না। তাই বিশ্বজগৎ হলো সৃষ্ট।
৪. জগতের কারণ আছে : গাজালি মনে করেন, জগতের বিভিন্ন বিষয়াদির পিছনেও একটা কারণ আছে। যার কারণ আছে যা কখনো চিরন্তন হতে পারে না। তা সব সময়েই সৃষ্ট। সুতরাং জগৎ সৃষ্টির ইচ্ছাই হলো জগতের কারণ।
৫. জগৎ অনাদি ইচ্ছার ফসল নয় : আল গাজালি সব সময় জগতে অনাদি ইচ্ছার কথা অস্বীকার করেন। তাঁর মতে, আল্লাহ যখন কোন কিছু হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন তখনই হয়ে যায়। সুতরাং অনাদি ইচ্ছার সাথে জগৎ সৃষ্টির কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই।
৬. সর্বেশ্বরবাদ গ্রহণযোগ্য নয় : অনেক দার্শনিকরা আল্লাহ এক, অনাদি ও অবিচ্ছেদ্য মনে করেন। এজন্য তারা জগৎকে অনাদি বলে আখ্যায়িত করেন। গাজালি বলেন, দার্শনিকরা পর্যাপ্ত যুক্তির মাধ্যমে সর্বেশ্বরবাদ প্রমাণ করতে পারেন নি। তাই গাজালি জগৎকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল বলে মনে করেন।
৭. আল্লাহ দেশ কালের ঊর্ধ্বে : পরম করুণাময় আল্লাহ কাল সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি কখনো কাল দ্বারা সীমিত হতে পারেন না। দেশ, কাল, গতি সবই অসীম। একসময় দেশ, কাল, গতি কিছুই ছিল না। একমাত্র আল্লাহই ছিলেন। সুতরাং অনন্ত কাল বলে কিছুই ছিল না।
নির্গমনতত্ত্বের সমালোচনা : জগতের উৎপত্তির বিষয়ে নির্গমনতত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। এ মতবাদ অনুসারে বিশ্বজগৎ নির্গত হচ্ছে চিরন্তন ও অনাদি সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। ফালাসিফা সম্প্রদায়ের কিছু কিছু
দার্শনিক ছিলেন তারা কখনো আল্লাহকে বিশ্বাস করতেন না। তারা কখনো সৃষ্টিকর্তাকে জগতের স্রষ্টা হিসেবে স্বীকার করেন নি। তারা নির্গমনতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তারা বলেন, জগৎ নির্গত হচ্ছে পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার সত্তা হতে। জগৎ ও সৃষ্টিকর্তা এমনভাবে সম্পর্কযুক্ত যে, জগৎ থাকা মানেই সৃষ্টিকর্তা থাকা আর সৃষ্টিকর্তা থাকা মানেই জগৎ থাকা । সৃষ্টিকর্তা ও জগৎ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যেমন- সূর্য উদিত হওয়া মানেই দিন আরম্ভ হওয়া। সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ ও জগৎ গভীর
সম্পর্কে আবদ্ধ। তাই আল্লাহ থাকার অর্থই হচ্ছে জগৎ থাকা। সুতরাং সৃষ্টিকর্তা ও জগৎ অনাদি ও অনন্ত । গাজালি বলেন, দার্শনিকরা নির্গমনতত্ত্ব নিয়ে যে আলোচনা করেছেন তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নয়। তার কিছু সমালোচনা রয়েছে যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
১. নির্গমনতত্ত্ব অনুযায়ী আল্লাহ ও জগৎ অবিচ্ছেদ্য অংশে আবদ্ধ। এতে আল্লাহর সুনাম খুন্ন হয়। কিন্তু আল্লাহ না থাকলে তাঁর পরমসত্তাকে কখনো স্বীকার করা যায় না।
২. আল্লাহর জগৎ বহির্ভূত স্বতন্ত্র সত্তাকে স্বীকার না করলে কোন মানুষই গুণগান ও উপাসনা করতে পারেন না। তখন জগতের সব মানুষ হয়ে যায় সৃষ্টিকর্তার অধীন।
৩. বিশ্বজগতের বৈচিত্র্যকে নির্গমনত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে না। নির্গমনতত্ত্ব অনুযায়ী যদি এক থেকে এক নির্গত হয় তাহলে জগতের সবকিছু একক সত্তায় পরিগণিত হবে। সুতরাং জগৎ বৈচিত্র্য ও বহুত্বে ভরপুর।
৪. প্রথম বুদ্ধিবৃত্তির সম্ভাব্য অস্তিত্ব ও দ্বিতীয় বৃদ্ধিবৃত্তির দৈহিক গঠন এই দুইয়ের মধ্যে কী সম্পর্ক হতে পারে তার কোন ব্রাক্যা নিগর্মন তত্ত্বে নেই।
৫. সর্বোচ্চ মন্ডলের সকল অংশ এবং সর্বোচ্চ মন্ডলের বিপরীত গুণ। সম্পন্ন অংশ কখনো নির্গমনতত্ত্ব অনুসারে ব্যাখ্যা করা যায়।
মূল্যায়ন : ইসলামের শরীয়ত অনুযায়ী আল্লাহ জগতের স্রষ্টা। জগতে যা কিছু আছে তার সবকিছুই খোদার সৃষ্টি। তিনি অনাদি ও অনন্ত । তিনি ছাড়া জগতের কোন কিছুই ছিল না। তিনি জগৎ সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে, “আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন।” (সূরা শুরা আয়াত ৪৯)। আল গাজালি দার্শনিকদের মতবাদ সমালোচনা করতে গিয়ে শরীয়তের শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। যে সব দার্শনিক জগৎকে খোদার সাথে অনাদি বলেছেন তিনি তাদেরকে কাফের বলেছেন। খোদার সাথে অন্যকে তুলনা করা শরীয়তের পরিপন্থী। সুতরাং জগতের যা কিছু আছে অর্থাৎ জীবজন্তু, উদ্ভিব সবকিছুকে আল্লাহ শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ইসলাম অনুসারে আল্লাহ পরম স্রষ্টা। তিনিই সবকিছুর আদি উৎস। গাজালির মতে, আপান-আপনি জগৎ সৃষ্টি হয় নি। আল্লাহ জগৎকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি যখন কোন কিছু হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন তখনই হয়ে যেত। সুতরাং গাজালির সৃষ্টিতত্ত্বের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%9a%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!