অথবা, আল গাজালির জ্ঞানতত্ত্ব আলোচনা কর।
অথবা, আল গাজালির জ্ঞানতত্ত্ব বর্ণনা কর।
অথবা, আল গাজালির জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কে যা জান বিস্তারিত লেখ।
অথবা, আল গাজালির জ্ঞানতত্ত্ব বিশ্লেষণ কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
ইমাম আল গাজালি ছিলেন মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তাঁর দার্শনিক চিন্তা ধারার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামকে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস হতে রক্ষা করা। জাগতিক সাফল্য এবং বস্তুবাদী চিন্তাধারার বিকাশের ফলে মুসলমানদের ভিতর পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে শৈথিল্য পরিলক্ষিত হচ্ছিল। ইমাম আল গাজালি তার
যুক্তি এবং লেখনী দ্বারা মুসলিম সমাজকে জাগ্রত করেছিলেন। তৎকালীন ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনের অস্থিরতা এবং জটিলতাই আল গাজালির অভিমতকে আবশ্যকীয় করেছিল ।
আল গাজালির জ্ঞানতত্ত্ব : জ্ঞানতত্ত্ব হলো দর্শনের এমন একটি শাখা যেখানে জ্ঞানের স্বরূপ, উৎস, শর্ত, সীমা, সম্ভাবনা ও বৈধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। ইমাম আল গাজালিও তাঁর ‘আল-মুনকিদ মিল-আল’ নামক গ্রন্থসহ ‘অন্যান্য গ্রন্থে তার জ্ঞান সম্পর্কিত বিষয় আলোচনা করেছেন। তার বক্তব্য ছিল কোন বিষয়ে সুচিন্তিত জ্ঞান অর্জন করতে হলে জ্ঞানের উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোকপাত করা আবশ্যক হয়ে উঠে। তাঁর জ্ঞানতত্ত্ব পর্যালোচনা করলে আমরা নিম্নলিখিত দিকগুলো পাই :
১. জ্ঞানের উৎসসমূহ পর্যালোচনা : জ্ঞান সম্পর্কিত আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো জ্ঞানের যেসব স্বীকৃত উৎস রয়েছে তার পর্যালোচনা করা। আল গাজালি কঠোর সাধনার মাধ্যমে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার উপর দখল স্থাপন করেন। তিনি বলেছেন, বিশ বছর বয়সের মধ্যে প্রচলিত কোন মতবাদ বা বিশ্বাস সম্পর্কে তাঁর অজানা ছিল না। কোন সুফির মরমি সাধনা, দরবেশের তত্ত্বকথা, নাস্তিকের নাস্তিকতাও তাঁর অজ্ঞাত ছিল না। তাঁর মত ছিল, কোন মতকেই অবজ্ঞা করা যাবে না। যেটি প্রয়োজন সেটি হলো তার যুক্তিনিষ্ঠ পর্যালোচনা।
২. জ্ঞানের বিভিন্ন উৎসের প্রতি সংশয় : গাজালি জ্ঞানের যে বিভিন্ন শাখা রয়েছে তা আত্মস্থ করার পর দেখলেন যে, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও বিজ্ঞান প্রতিটি শাখাই ত্রুটিপূর্ণ। এদের কোনটি এককভাবে সুনিশ্চিত জ্ঞান দিতে পারে না। তিনি দেখেন যে, ধর্মতত্ত্ববিদরা সত্যের অনুসন্ধ্যানী, তবে তাদের মধ্যে যুক্তির অভাব রয়েছে। দার্শনিকরা যুক্তি সহকারে তাদের আলোচনা করলেও তা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্য নয়। অন্যদিকে সমসাময়িক বিজ্ঞানও বিশ্বাস দ্বারা আবর্তিত হয়েছে।
৩. সত্যকে জানার জন্য পদ্ধতিগত সংশয় : আল গাজালি দেখান যে, প্রাধিকারবাদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের ফলে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও বিজ্ঞানের অযথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু জ্ঞান চর্চা হবে স্বাধীন এবং প্রাধিকার মুক্ত। এ স্বাধীন মনন সবকিছুতেই সংশয় করবে যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সুনিশ্চিত সত্যকে আবিষ্কার করা।
৪. জ্ঞানের উৎসসমূহ সম্পর্কে সংশয় : একজন সংশয়বাদীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জ্ঞানের উৎসসমূহ সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করা। কেননা জ্ঞানের উৎস যদি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তাহলে নিশ্চিত জ্ঞান পাওয়ার আর কোন উপায় থাকে না। গাজালির মতে, জ্ঞানের উৎস দুটি। যথা : ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ ও বিচারবুদ্ধি। ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ যথার্থ জ্ঞানের উৎস হতে
পারে কি না তা বিচার করতে গিয়ে গাজালি বলেছেন, এটি শর্তসাপেক্ষ। সুতরাং জ্ঞানের যথার্থ উৎস বুদ্ধি কিংবা ইন্দ্রিয় হতে পারে না।
৫. জ্ঞানের উৎস হিসেবে প্রত্যাদেশ ও স্বজ্ঞা : স্বজ্ঞা হলো এমন একটি বিষয় যার দ্বারা মানব মন কোন মাধ্যম ছাড়াই কোন কিছুকে জানতে পারে। স্বজ্ঞাকেই গাজালি জ্ঞানের যথার্থ উৎস বলে মনে করেন। তবে স্বজ্ঞার চেয়ে সুনিশ্চিত
হলো প্রত্যাদেশ। আল্লাহ যাদের মনোনীত করেছেন তারা ছাড়া আর কারো দ্বারা এ ধরনের জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়।
৬. স্বজ্ঞাকে জ্ঞানের যথার্থ উৎস মনে করার কারণ : আল গাজালি তাঁর গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে স্বজ্ঞাকেই যথার্থ জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি যে কারণে তা মনে করেন তা নিম্নরূপ :
স্বজ্ঞা ইন্দ্রিয়ের মতো জাগতিক সীমাবদ্ধতা হতে মুক্ত। স্বজ্ঞার জ্ঞান আমরা কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি পাই। আর তাই এটি প্রান্ত হতে পারে না।
ইন্দ্ৰিয় কিংবা বুদ্ধি কোন বিষয় বা বস্তুর বাইরের দিক হতে প্রত্যক্ষণ করেন। কিন্তু স্বজ্ঞার ক্ষেত্রে জ্ঞান এবং জ্ঞেয় একাত্ম হয়ে যায়। আর তাই এটি সংশয়মুক্ত জ্ঞান দিতে সক্ষম।
প্রত্যাদেশ সমাপ্ত হয়েছে। কেননা নবুয়তের সমাপ্তি ঘটেছে। তাছাড়া প্রত্যাদেশের জ্ঞানসাধনা মানুষের জন্য সমীচীন
নয়। মানুষ তার স্বজ্ঞার দ্বার উন্মোচনে সচেষ্ট হতে পারে, যদিও বিষয়টি আল্লাহর অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, আল গাজালির দার্শনিক পদ্ধতি ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক । শুধু তাই নয় তার দর্শন ছিল প্রজ্ঞার ও বুদ্ধির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এ কারণে তার নাম বিশ্ব ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো। মুসলিম বিশ্বে তার গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম সমাজে এককভাবে গাজালির প্রভাব সম্ভবত অন্য যে কোন মুসলিম স্কলাস্টিক ধৰ্ম। আল
গাজালির শ্রেষ্ঠত্ব এখানে যে, ডেকার্ট হতে শুরু করে বার্গসো পর্যন্ত সমগ্র পাশ্চাত্য দর্শনের প্রধান বিষয় তিনি পূর্বেই আলোচনা করেছেন।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%9a%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!