অথবা, আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে দার্শনিকদের বিরুদ্ধে গাজালির অভিযোগকে ইবনে রুশদ
কিভাবে দেখেছেন তা আলোচনা কর।
অথবা, আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে ইবনের রুশদ কিভাবে দার্শনিকদের যুক্তি মূল্যায়ন করেছেন বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর।
অথবা, আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে দার্শনিকদের বিরুদ্ধে গাজালির অভিযোগকে ইবনে রুশদ

কিভাবে দেখছেন তা বর্ণনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা : পাশ্চাত্যের মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে ইবনে রুশদ ছিলেন একজন সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী চিন্তাবিদ। স্পেনের কর্ডোভার এক আইনশাস্ত্রবিদ পরিবারে তার জন্ম। স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী ইবনে রুশদ এরিস্টটলের একজন অনুগত ও একনিষ্ঠ ভাবশিষ্য ছিলেন। ইবনে রুশদ আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে ইমাম -আল গাজালি কিংবা দার্শিনিকদের মতবাদসমূহ কোনটিকেই সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত মনে করেন নি। ইসলাম ধর্ম চরম একত্ববাদে বিশ্বাসী। আল্লাহর সাথে কোনপ্রকার শরিক করাকে ইসলামি শরিয়ত অনুসারে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে মনে করা হয়।
আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে রুশদের মতবাদ : ইমাম আল গাজালি শরিয়ত অনুযায়ী আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করেন। তবে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, আল্লাহর একত্ব প্রমাণ করতে দিয়ে দার্শনিকগণ যেসব যুক্তি দিয়েছেন তা ত্রুটিমুক্ত নয়। এভাবে আল্লাহর একত্ব প্রমাণ করা যৌক্তিকভাবে এবং শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। ইবনে রুশদ বলেন, ইমাম গাজালি দার্শনিকদের বিরুদ্ধে যে সকল যুক্তি উপস্থাপন করেছেন তার মধ্যেও অনেক ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে দার্শনিকদের বিরুদ্ধে গাজালির অভিযোগসমূহ ইবনে রুশদ যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন তা আলোচনা করা হলো :
গাজালি কর্তৃক দার্শনিকদের মতবাদ খণ্ডন : ইমাম আল গাজালি দার্শনিকদের মতবাদসমূহ ভ্রান্ত বলে কিছু যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তার যুক্তিসমূহ নিম্নরূপ :
প্রথমত, আল্লাহর একত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে দার্শনিকগণ বলেছেন যে, অবশ্যম্ভাবী সত্তাকে একাধিক বলে ধরে নিলে তা একটি জাতি বুঝাবে। গাজালি বলেন, তাদের এ যুক্তি সঠিক নয়। কেননা অবশ্যম্ভাবী অর্থ হলো যার কারণ নেই। আর যার কারণ নেই এমন কিছু অনিবার্যভাবে এক হবে এমন কোন আবশ্যিকতা নেই।
দ্বিতীয়ত, অবশ্যম্ভাবী পরম সত্তার কোন কারণ নেই। এটা দার্শনিকদের একটি নঞর্থক যুক্তি বলে উল্লেখ করেন ইমাম আল গাজালি। এর দ্বারা ঐ পরম সত্তা তার নিজের সারসত্তা থেকে অস্তিত্বশীল বা অস্তিত্বহীন কিছু বুঝা যায় না।
তৃতীয়ত, গাজালির মতে, অস্তিত্বের অবশ্যম্ভাব্যতা অর্থেও যদি অবশ্যম্ভাবী সত্তার ক্ষেত্রে বহুত্ব আরোপ না করা হয় তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থত, অনিবার্য অস্তিত্বশীল সত্তার ক্ষেত্রে বহুত্ব আরোপিত হতে পারে কি না এ প্রশ্নের জবাবে দার্শনিকগণ নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। তবে গাজালি দার্শনিকদের মতবাদকে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, আল্লাহর একত্ব তখন প্রমাণিত হতে পারে যখন তার মধ্যে সম্ভাব্য বহুত্বের অবকাশ না থাকে।
পঞ্চমত, গাজালির মতে, সত্তাকে দার্শনিকগণ যেভাবে শ্রেণীবিভাগ করেছেন তা কেবল জড় দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় ।
ইবনে রুশদ কর্তৃক গাজালির মতবাদ খণ্ডন : গাজালি যেভাবে দার্শনিকদের মতবাদ সমালোচনা করেছেন ইবনে রুশদ তা পর্যালোচনা করে দেখেন যে গাজালির সকল আপত্তি সঠিক নয়। বরং দার্শনিকদের মতবাদ কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্ব রয়েছে। নিম্নে ইবনে রুশদের অভিমত তুলে ধরা হলো :
প্রথমত, ইবনে রুশদ গাজালির বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম যে অভিযোগটি উত্থাপন করেন তা হচ্ছে দার্শনিকদের যুক্তি বলে গাজালি যেসব যুক্তি দিয়েছেন তার অধিকাংশই মূলত ইবনে সিনার মতবাদ। এর অনেক মতবাদই মুসলিম
দার্শনিকবৃন্দ বা প্রাচীন কালের দার্শনিকদের মতবাদ নয়। সুতরাং গাজালি এসব মতবাদের দায়ভার অবলীলায় দার্শনিকদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, ইবনে সিনার সম্পর্কে ইবনে রুশদ বলেন, তার আলোচনা ছিল অনেকটা সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা এবং সিদ্ধান্তগুলোও ছিল সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক। তার বিরুদ্ধে অনেক যৌক্তিক আপত্তি উত্থাপিত হতে পারে। কিন্তু খুব সাধারণভাবে এটাকে গ্রহণ করলে কোন বিভ্রান্তি পরিদৃষ্ট হবে না। সুতরাং ইবনে সিনার বক্তব্ যকে গ্রহণ করা যায়।
তৃতীয়ত, ইমাম গাজালির মতে, দার্শনিকগণ অবশ্যম্ভাবী সত্তা বলতে এমন সত্তার কথা বলেছেন যার কোন কারণ নেই। তবে দার্শনিকগণ যখন বলেন, অনিবার্য সত্তার কোন কারণ নেই। তখন এর অর্থ দাঁড়াবে, যে সত্তার কারণ নেই, তার কোন কারণ নেই অথবা ‘অবশ্যম্ভাবী সত্তা হয় অবশ্যম্ভাবী সত্তা’ এমন কথা নিঃসন্দেহে অর্থহীন উক্তি ছাড়া কিছুই নয়। তবে ইবনে রুশদের মতে, বিষয়গুলো এ রকম নয়। অনিবার্য সত্তার অস্তিত্বের অনিবার্যতা তার নিজের সারসত্তা থেকে অথবা এর উৎপত্তি অন্য কোন সত্তা থেকে, তাহলেও এ বিকল্পের কোন অর্থ হয় না।
চতুর্থত, অবশ্যম্ভাবী সত্তার কোন কারণ নেই-গাজালি একে অবশ্যম্ভাবী সত্তা সম্পর্কে একটি নঞর্থক উক্তি বলে দাবি করেছেন। ইবনে রুশদ এ সম্পর্কে বলেন যে, দুটি পৃথক জিনিস কেবল তাদের নাম ছাড়া সবদিক থেকে পৃথক হতে পারে যেখানে তাদের কোন জাতিগত ঐক্য নেই। তবে পার্থক্য পূর্ণ হলেই যে তা অযৌক্তিক বা বহুত্বসূচক হবে এমন কথা বলা যায় না।
পঞ্চমত, দার্শনিকদের বিরুদ্ধে গাজালির আর একটি অভিযোগ হলো দার্শনিকগণ প্রথম সত্তা বা আল্লাহকে এমনভাবে বিভাগ করেছেন যাতে করে তা জড় দ্রব্যের সাথে তুলনীয় হয়ে গেছে। তবে ইমাম আল গাজালির এ ধরনের মতবাদের তীব্র প্রতিবাদ করেন ইবনে রুশদ। ইবনে রুশদ বলেন, দার্শনিকগণ কখনই আল্লাহ বা প্রথম সত্তাকে জড় দ্রব্যের সাথে
তুলনীয় বলে মনে করেন নি সুতরাং গাজালির এ মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে ইবনে রুশদ ইমাম গাজালি কিংবা দার্শনিকদের মতবাদসমূহ কোনটাই প্রাধান্য দেন নি। এমনকি তিনি দার্শনিকদের বিরুদ্ধে গাজালির অভিযোগগুলোর বিরোধিতা করেছেন । তিনি মনে করেন দার্শনিকদের বিরুদ্ধে গাজালির সকল আপত্তি সঠিক নয় । মূলত তার আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে দার্শনিকদের বিরুদ্ধে গাজালির যুক্তিগুলো মিথ্যা প্রমাণিত করা। সুতরাং মুসলিম দর্শনে তার আলোচনার গুরুত্ব অপরিসীম।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%aa%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9a%e0%a6%ae-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a6%a6/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!