অথবা, আইন বিভাগে নারীর অংশগ্রহণ মূল্যায়ন কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইন, শাসন ও বিচার বিভাগে নারীর অংশগ্রহণের ইতিহাস অনেক পুরোনো। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা দীর্ঘ সময় ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে পুরুষের চেয়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব অনেক কম। এর কারণ হচ্ছে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের বাইরের কাজের অনুপযুক্ত মনে করা হয় এবং গৃহের কাজের উপযুক্ত মনে করা হয়। এ ধরনের পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে নারীরা বাইরের কাজে তেমন অংশগ্রহণ করতে পারে না তাই এসব প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ কম। কিন্তু দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এবং জেন্ডার সংবেদনশীল সমাজ গঠনের জন্য আইন, বিচার এবং শাসন বিভাগে নারীর সমঅংশীদারিত্ব প্রয়োজন ।
প্রশ্নের চাহিদানুযায়ী আইন বিভাগে নারীর অবস্থানের প্রকৃতি নিম্নে সন্নিবেশিত হলো :
আইন বিভাগে নারী : বাংলাদেশের আইনসভা জাতীয় সংসদ নামে পরিচিত। ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় সংসদে ১৯৯৬ সালে নারী সদস্য ছিল মাত্র ৮ জন (উপনির্বাচনে বিজয়ী ৩ জনসহ)। ১৯৯১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫ জন। আর ২০০১ সালের নির্বাচনে ৬ জন নারী জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রথম সংসদ থেকে সপ্তম সংসদ পর্যন্ত সংরক্ষিত আসনে মোট ১৬৬ জন নারী সংসদ মনোনীত হয়েছেন। এর মধ্যে একাধিকবার সদস্য হয়েছেন ৮ জন। স্বাধীনোত্তর পিছিয়ে পড়া নারীসমাজের জন্য জাতীয় সংসদে নারীর সীমিত অংশগ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে Legal Framework Order of 1970 অনুসারে সংবিধানের ৬৫নং ধারায় সংসদের ১৫টি আসন সময়কাল ১০ বছর নারীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে ১৫টির স্থলে ৩০টি করা হয় এবং সময়সীমা ১০ বছরের পরিবর্তে ১৫ বছর করা হয়। ১৯৮৭ সালে প্রথম ১৫ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চতুর্থ সংসদে নারীদের জন্য কোন সংরক্ষিত আসন ছিল না। তবে জাতীয় পার্টির ৪ জন মহিলা সদস্য সাধারণ আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে সংবিধানের দশম সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের মেয়াদ আরো ১০ বছর বাড়ানো হয়। এর ফলে পঞ্চম সংসদে (১৯৯১-১৯৯৫) ৩০ জন মহিলা সংসদ সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত হন। এ সংসদে আওয়ামী লীগের ৫ জন এবং বিএনপির ১ জন সদস্য সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ষষ্ঠ (১৯৯৬-৯৬) সংসদে ৩০ জন মহিলা সদস্য সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের সবাই ছিলেন বিএনপির দলীয় মনোনীত। এ সংসদে আরো ৩ জন মহিলা সাধারণ আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক দিন। সপ্তম (১৯৯৬-২০০১) সংসদে ৩০ জন মহিলা সদস্য সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ২৭ জন আওয়ামী লীগের এবং ৩ জন জাতীয় পার্টির দলীয় সদস্য। এ সংসদে ৮ জন মহিলা সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংবিধানের দশম সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের সময়কাল ২০০১ সালে শেষ হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘদিন সংরক্ষিত আসনে নারী সদস্য ছিল না। ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সময়সীমা আরো ১০ বছর বাড়ানো হয় এবং সদস্য সংখ্যা ৪৫-এ উন্নীত করা হয়। এ বিধানের অধীনে ২০০৫ সালে ৪৫ জন নারী সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত হন। এদের মধ্যে ৩৯ জন বিএনপির, জামায়াতে ইসলামীর ৩ জন, জাতীয় পার্টির ২ জন ও ইসলামি ঐক্যজোটের ১ জন সদস্য ছিল। তবে এ ব্যাপারে নারী সংগঠনগুলো পরোক্ষ নির্বাচনের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ বা সরাসরি নির্বাচনের দাবি করে আসছে। এ সংসদে সাধারণ আসন থেকে ৬ জন নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ২ জন আওয়ামী লীগ, ৩ জন বিএনপি ও ১ জন জাতীয় পার্টির সদস্য ছিলেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ২০১১ এর মাধ্যমে নারীদের জন্য আরো ৫টি সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি করে ৫০টি করা হয়েছে। নারীরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলেও সংসদে তাদের ভূমিকা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও আচরণ সংসদের অভ্যন্তরেও বিদ্যমান, যা নারী সদস্যদের ভূমিকাকে বাধাগ্রস্ত করে। উপরন্তু সংরক্ষিত আসনের নারীরা রাজনীতির ক্ষেত্রে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ। এর ফলে তারা সংসদে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেন না।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, আইন বিভাগে নারীর অবস্থান এখনো তেমন ইতিবাচক নয় । আইন বিভাগে নারীর সমঅংশীদারিত্ব ব্যতীত নারী উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নও সম্ভব নয়। কারণ দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা যদি সবকিছু থেকে পিছিয়ে থাকে তাহলে সমাজেরও উন্নয়ন হবে না। তাই সবাইকে বুঝতে হবে নারী উন্নয়ন মানে সমাজেরও উন্নয়ন। একথা উপলব্ধি করে রাষ্ট্রের আইন বিভাগে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে তাহলে নারীদেরও যেমন উন্নয়ন হবে তেমনি সমগ্র সমাজেরও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%ae-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!